দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক খনিজ ও ধাতব বাজারে আধিপত্য ধরে রেখেছে চীন। বড় অংকের বিনিয়োগের মাধ্যমে আফ্রিকার খনিজ সম্পদ খাতে প্রভাব তৈরি করেছে দেশটি। তবে সাম্প্রতিক বছরে মহাদেশটিতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে বেইজিং-ওয়াশিংটন বাণিজ্য প্রতিযোগিতার নতুন ময়দানে পরিণত হয়েছে আফ্রিকা। খবর বিবিসি।
দুষ্প্রাপ্য খনিজ, লিথিয়াম কোবাল্ট, ট্যাংস্টেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও ধাতব সম্পদে সমৃদ্ধ আফ্রিকা। ইলেকট্রনিক সামগ্রী, বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি, ডাটা সেন্টার, এমনকি সামরিক অস্ত্র তৈরিতে এসব উপাদান অপরিহার্য।
আফ্রিকা থেকে এসব ধাতব উপাদান সংগ্রহের মাধ্যমে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল চীন। সম্প্রতি দুষ্প্রাপ্য খনিজের নিয়ন্ত্রণে বেইজিং কঠোর ব্যবস্থা নিলে বিচলিত হয়ে ওঠে ওয়াশিংটন। এ পরিস্থিতিতে আফ্রিকার খনিজ সম্পদের দিকে মনোযোগ বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের। তবে বিনিয়োগ বৃদ্ধির এ নীতি আগেই কার্যকর হচ্ছে। ২০২৩ সালে চীনকে পেছনে ফেলে আফ্রিকার সবচেয়ে বড় বিদেশী বিনিয়োগকারী হয়ে উঠেছে ওয়াশিংটন।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের চায়না আফ্রিকা রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের তথ্যানুসারে ২০২৩ সালে আফ্রিকায় ৭৮০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই বছর চীন বিনিয়োগ করেছে ৪০০ কোটি ডলার। মার্কিন বিনিয়োগের নেতৃত্ব দিচ্ছে ইউএস ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশন (ডিএফসি) নামের সরকারি সংস্থা। চীনের কৌশলগত প্রভাব মোকাবেলায় ২০১৯ সালে ডিএফসি প্রতিষ্ঠিত হয়।
গত বছর রুয়ান্ডার খনি কোম্পানি ট্রিনিটি মেটালসকে ৩০ লাখ ৯০ হাজার ডলারের অনুদান দিয়েছে ডিএফসি। এ প্রকল্পের আওতায় তিনটি খনিতে টিন, ট্যানটালাম ও ট্যাংস্টেন উত্তোলন করবে ট্রিনিটি মেটালস। কোম্পানির চেয়ারম্যান শন ম্যাককর্মিক বলেন, ‘মার্কিন সরকার আমাদের কার্যক্রমকে সমর্থন করেছে, যাতে সরবরাহ চেইন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে নেয়া যায়।’
কোম্পানিটি এখন রুয়ান্ডার টিন ও টাংস্টেন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাচ্ছে। পেনসিলভানিয়ার একটি কারখানায় প্রক্রিয়াজাত হবে এসব ধাতু। ট্রিনিটির ৫ শতাংশ মালিকানা রুয়ান্ডা সরকারের। আয়ারল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ বিনিয়োগ সংস্থা টেকমেটও কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডার।
আফ্রিকার খনিতে বিপজ্জনক পরিবেশে অদক্ষ শ্রমিকদের ব্যবহার করে খনিজ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু ম্যাককর্মিক দাবি করছেন, দেশটিতে পেশাদারভাবে সংঘাতমুক্ত, শিশুশ্রমবিহীন পদ্ধতিতে খনিজ উত্তোলন করা হয়।
এ বিষয়ে নামিবিয়ার ব্যাংকিং গ্রুপ এফএনবির অর্থনীতিবিদ সেপো হাইমাম্বো বলেন, ‘আফ্রিকার দেশগুলোকে তাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে নিজেদেরই দাঁড়াতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো অনুগ্রহের আশা রাখা উচিত নয়।’
তার মতে, শুধু নগদ লেনদেনের বাইরে গিয়ে দেশগুলোকে যৌথ উদ্যোগ, স্থানীয় ইকুইটিতে অংশগ্রহণ ও উৎপাদন ভাগাভাগির মতো কাঠামোর দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। কাঁচামাল রফতানি না করে আফ্রিকায় প্রক্রিয়াজাতের সুযোগ বৃদ্ধি করে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক লাভ বাড়াবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
মার্কিন কিছু প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে আফ্রিকায় গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও ধাতু পরিশোধনাগার তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এমন একটি মার্কিন কোম্পানি রিএলিমেন্ট। এটি দক্ষিণ আফ্রিকার গাউটেং প্রদেশে পরিশোধনাগার নির্মাণ করছে।
প্রতিষ্ঠানটির সিইও বেন কিনকেড বলেন, ‘খনি প্রকল্পের পাশাপাশি পরিশোধনাগার স্থাপন করে আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব করা জরুরি। তাহলেই শ্রমদক্ষতা বৃদ্ধি, স্থানীয় অর্থনীতি গঠন ও শিল্প উন্নয়নের মাধ্যমে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো আফ্রিকার খনিতে আরো প্রভাব বিস্তার করতে পারবে।’
তবে কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির অর্থনীতিবিদ প্রফেসর লি ব্র্যানস্টেটার বলেন, ‘আফ্রিকার দেশগুলোর ওপর চীনের বিনিয়োগের নেতিবাচক প্রভাব বিরাজ করছে। ঠিক এ সময় ট্রাম্পের শুল্কনীতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আগ্রহ কমিয়েছে। বর্তমান প্রশাসন যদি অযৌক্তিকভাবে শুল্ক আরোপ না করত, তাহলে চীনা প্রকল্পগুলোর প্রতি আফ্রিকান অসন্তোষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত আরো ভালো ফল পেত।’